যে কারণে ঝুঁকি নেবেন না শেখ হাসিনা!
শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে তিনি দেশে ফেরার কথা বললেও, বাস্তবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা সহজ হবে—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে দেশে ফেরার পর তার বিরুদ্ধে চলমান আইনগত প্রক্রিয়া ও আদালতের রায়কে ঘিরে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজেই জানিয়েছিলেন, তিনি ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছিলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি তার জীবনের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবুও তিনি দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান।
দেশে ফিরলেই কী হতে পারে?
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তার বিরুদ্ধে থাকা আইনগত প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। রায়টি ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের সঙ্গে সম্পর্কিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সঙ্গে যুক্ত। শেখ হাসিনা অবশ্য তার বিরুদ্ধে ওঠা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ কারণে দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার ও আদালতের মুখোমুখি হতে হবে—এমন পরিস্থিতিই সামনে রয়েছে। সরকারের তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও সেপ্টেম্বর মাসে বলেছেন, সরকার তাকে স্বেচ্ছায় ফিরে আসার অপেক্ষায় না থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়।
ফলে শেখ হাসিনার জন্য বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সরাসরি আইনি পরিণতির প্রশ্নও জড়িত।
শেখ হাসিনা নিজেই ঝুঁকির কথা বলেছেন
দেশে ফেরার বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে কিংবা আরও গুরুতর বিপদের মুখে পড়তে পারেন। তারপরও তিনি দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানান।
অর্থাৎ, সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি অবগত নন—এমন নয়। বরং তার নিজের বক্তব্যেই বোঝা যায়, দেশে ফেরার পর কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন, সে বিষয়ে তিনি সচেতন।
তাহলে কেন দেশে ফেরার কথা বলছেন?
শেখ হাসিনার বক্তব্য অনুযায়ী, তার প্রধান উদ্দেশ্য হলো দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া। তিনি আরও বলেছেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনিও দেশে ফিরতে চান।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তিনি দলের নেতাদের বলেছেন দেশে ফিরে সবাইকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। তবে তিনি কোন দিন, কোন পথে এবং কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি দেননি।
এ কারণে ডিসেম্বরের কথা বলা হলেও এটিকে এখনই নিশ্চিত প্রত্যাবর্তনের তারিখ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
ভারতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করে আসছে। একই সময়ে শেখ হাসিনা নিজেও বলেছেন, তিনি নিজে দেশে ফিরতে চান।
অন্যদিকে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ তারা প্রতিষ্ঠিত আইন ও প্রক্রিয়ার আওতায় বিবেচনা করছে। আগস্টে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাই তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে শুধু তার নিজের সিদ্ধান্তই নয়, ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
‘ঝুঁকি নেবেন না’—এমন আলোচনা কেন?
শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কথা ঘোষণা করার পর বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—বাস্তবে তিনি কি এমন একটি ঝুঁকি নেবেন, যেখানে দেশে প্রবেশের পর তাকে গ্রেপ্তার এবং আদালতের রায়ের মুখোমুখি হতে হতে পারে?
জুলাইয়ে প্রকাশিত কিছু বিশ্লেষণেও তার ঘোষণাকে সম্ভাব্য রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখার আলোচনা হয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষকদের মতামত; শেখ হাসিনার নিজের বক্তব্য হলো, তিনি দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করতে চান।
তাই তিনি শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরবেন কি না, সেটি এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
সামনে কী হতে পারে?
আগামী কয়েক মাসে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হতে পারে—শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কি না, ভারত তার প্রত্যর্পণ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনগত প্রক্রিয়া কী অবস্থায় থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা বলেছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত তার ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ বা চূড়ান্ত যাত্রাপথ ঘোষণা হয়নি। একইভাবে ভারতও তাকে নির্দিষ্ট কোনো তারিখে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি।
সুতরাং, “শেখ হাসিনা দেশে ফিরছেন”—এটি তার ঘোষিত পরিকল্পনা; আর “তিনি অবশ্যই ফিরবেন” বা “তিনি ঝুঁকি নিয়ে ফিরবেন না”—এগুলো এখনো নিশ্চিত তথ্য নয়। তার নিজের বক্তব্য, বাংলাদেশের আইনগত পরিস্থিতি এবং ভারতের অবস্থান—এই তিনটি বিষয় মিলিয়েই আগামী দিনের পরিস্থিতি নির্ধারিত হবে।