বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানানোর পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এবার তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ও বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণ অনুরোধ নিয়ে ভারতের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে নয়াদিল্লি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের যে অনুরোধ করা হয়েছে, সেটি ভারত পেয়েছে এবং বিষয়টি দেশটির প্রচলিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, প্রত্যর্পণের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভারতের আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করা হবে।
দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা
২০২৬ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। তিনি জানান, তাকে ফেরত নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে বারবার চিঠি দিলেও তিনি নিজেই দেশে ফিরতে চান। তবে তিনি ঠিক কোন তারিখে বা কোন পথে দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সূচি জানাননি।
এর আগে জুন মাসে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা বলেছিলেন, সব বাধা অতিক্রম করে তিনি ২০২৬ সালের মধ্যেই দেশে ফিরবেন।
ফলে তার ডিসেম্বরের ফেরার ঘোষণা সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—তিনি ভারতে অবস্থানরত থাকলে নয়াদিল্লির অবস্থান কী হবে এবং বাংলাদেশ যদি তাকে ফেরত চায়, তাহলে ভারত কী করবে?
এই প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট করেন, ভারতের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধ ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা করছে। প্রত্যর্পণের মতো বিষয়কে রাজনৈতিকভাবে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কাঠামোর মধ্যেই বিবেচনা করা হবে।
পরবর্তীতে আগস্টেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে। তখন জয়সওয়াল বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ ভারতের প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার আওতায় পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং সিদ্ধান্ত হলে তা জানানো হবে।
অর্থাৎ, শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফেরার ঘোষণা দিলেও ভারত এখন পর্যন্ত তাকে নির্দিষ্ট কোনো তারিখে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দেয়নি।
বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে আসছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকেও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় বিষয় এবং এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলমান এবং কূটনৈতিকভাবে এ বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রত্যর্পণের মতো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
এ মুহূর্তে এর কোনো নিশ্চিত উত্তর ভারত সরকার দেয়নি।
ভারতের প্রকাশ্য অবস্থান হলো—বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ পরীক্ষাধীন। ভারতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, নির্দিষ্ট সময়সীমা বা তার দেশে ফেরার পথ সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভারত শেখ হাসিনাকে অমুক দিনে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে’ বা ‘ভারত দেশে ফেরার অনুমতি দিয়ে দিয়েছে’—এ ধরনের নির্দিষ্ট দাবি দেখা গেলে সেটিকে সরকারি ঘোষণা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।